কালের আয়নায়

খালেদা জিয়া কি রাজনৈতিক বনবাসে যেতে চান

আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরী –

সম্প্রতি একটি ভারতীয় কাগজে মন্তব্য করা হয়েছে, বাংলাদেশের বিএনপি নেত্রীকে জামিন দিয়ে বিদেশে চিকিৎসার জন্য যাওয়ার সুযোগ দেওয়ার যে দুর্বল দাবি দলটি তুলেছে, তা রাজনীতিতে তাদের চরম পরাজয়ের আত্মস্বীকৃতি ছাড়া আর কিছু নয়। বিএনপির প্রথম দিকের দাবি ছিল, খালেদা জিয়াকে অবিলম্বে বিনা শর্তে মুক্তি দেওয়া, নইলে প্রবল গণআন্দোলন দ্বারা তাকে মুক্ত করে আনা হবে। নেত্রীর মুক্তি দাবিতে গণআন্দোলন দূরের কথা, গাছের একটি পাতাও তারা নড়াতে পারেননি।

জেলে বন্দি অবস্থায় খালেদা জিয়া অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। সুতরাং তার সুচিকিৎসার জন্য জেলের বাইরে কোনো হাসপাতালে আনা প্রয়োজন, এই দাবিতে বিএনপি যা করেছে তাও প্রহসন-নাটকের মতো, সরকার তাকে যে হাসপাতালে পাঠাতে চাইল বা পাঠাল, সেটি দেশের একটি উন্নত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান। তবু বিএনপি বায়না ধরেছিল, তাদের পছন্দের হাসপাতালে দলীয় নেত্রীকে পাঠাতে হবে। এই ধরনের দাবি বিশ্বের ইতিহাসে বিরল।

খালেদা জিয়া রাজনৈতিক নেত্রী, কিন্তু কোনো রাজনৈতিক বন্দি নন। তিনি দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত আসামি। রাজনৈতিক বন্দির কোনো সুযোগ-সুবিধা তাকে দেওয়া না হলে কোনো অন্যায় করা হয় না। তথাপি তাকে কারাগারে সাধারণ রাজনৈতিক বন্দির চাইতেও অনেক বেশি সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হয়েছে, যা সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদও কারাগারে থাকার সময় পাননি। খালেদা জিয়ার দাবি ছিল, এরশাদ সাহেবকে জেলে সাধারণ কয়েদির মতো রাখা। শেখ হাসিনা তা করেননি। খালেদা জিয়াকে তো তিনি কারাগারে একজন পরিচারিকা রাখারও সুবিধা দিয়েছেন।

বিএনপি হুঙ্কার দিয়ে বলেছিল, খালেদা জিয়াকে জেলে রেখে তারা সাধারণ নির্বাচনে যাবে না। তাও তারা গেছে। খালেদা জিয়া গত সাধারণ নির্বাচনকালে সম্পূর্ণ বিস্মৃত-প্রায় নেতা ছিলেন। বিএনপি ড. কামাল হোসেনকে এনে তাদের ঐক্যফ্রন্টের নেতার পদে বসিয়েছিল। কিন্তু আলাদিনের জাদু তিনি দেখাতে পারেননি। এখন কদাচ তাদের কণ্ঠে নেত্রীর মুক্তি দাবি শোনা যায়। নেত্রীর মুক্তি দাবিটি এখন তাদের কণ্ঠে রেটোরিক বা আপ্তবাক্যের মতো। কথাটা বলতে হয়, নইলে রাজনীতিতে টিকে থাকা যাবে না, এজন্য দাবিটি রাজনীতির মাঠে নয়, কণ্ঠে বাঁচিয়ে রাখা।

খালেদা জিয়ার মুক্তি নিয়ে যে কারও কোনো মাথাব্যথা নেই, তার প্রমাণ মাকে জেলে রেখে তারেক রহমান দিব্যি বিলাতে বিলাস ব্যসনে দিন কাটাচ্ছেন। বিলাতে তার কাজ বিরাট অর্থের সাহায্যে একটি বাহিনী পোষা। শেখ হাসিনা বিলাতে এলে এই বাহিনী দ্বারা তাকে কালো পতাকা দেখানো, অশ্নীল স্লোগান দেওয়ানো ইত্যাদি। এখন তাও থেমে গেছে। প্রমাণ হয়েছে তারেক পেপার টাইগার বা কাগজের বাঘ।

শেখ হাসিনার এবারের লন্ডন সফরকালে তারেক বাহিনীকে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে দেখা যায়নি। অনেকে বলেন, তারেকের রসদ ফুরিয়ে এসেছে। তাই এই বাজেট-কাট। তারেকের মধ্যে সামান্য সাহস ও নেতৃত্বগুণ থাকলে মায়ের মুক্তি দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য দেশে ফিরতেন। কারাবরণ করতেন। আমার ধারণা, তাহলে দেশের পরিস্থিতি বদলে যেত। কিন্তু সে সাহস তারেকের হয়নি। হাওয়া ভবনের অধীশ্বরের সে সাহস হতে পারে না। মনস্তাত্ত্বিকেরা বলেন, ‘স্বভাব দুর্বৃত্তের মনে কখনও সাহস জাগ্রত হয় না।’ শেখ হাসিনা মাথায় হুলিয়া, সকল বাধা বিঘ্ন, হুমকি অগ্রাহ্য করে এক-এগারোর সময় দেশে ফিরে এসেছিলেন। দেশের পরিস্থিতি পাল্টে গিয়েছিল।

বিএনপি, এমনকি তাদের ঐক্যফ্রন্টও যে দেশের রাজনীতিতে পরাজিত শক্তি তার প্রমাণ, এখন খালেদা জিয়া গুরুতর অসুস্থ- এই ধুয়া তুলে তাকে জামিন দিয়ে বিদেশে চিকিৎসার জন্য যেতে অনুমতি দেওয়ার জন্য সরকারের কাছে আবেদন-নিবেদন। ভারতীয় সাংবাদিক এটিকে বিএনপির রাজনৈতিক পরাজয়ের আত্মস্বীকৃতি আখ্যা দিয়ে সম্ভবত সঠিক কথাই বলেছেন।

কারাগারে খালেদা জিয়া কেন, যে কোনো সাধারণ কয়েদিও যদি গুরুতর রোগাক্রান্ত হয়, তাহলে তার সুচিকিৎসার দরকার। এটা মানবতার দাবি, সরকারের মানবিক দায়িত্ব। প্রথম কথা, খালেদা জিয়া জেলে গুরুতর অসুস্থ এটা সঠিক তথ্য না রাজনৈতিক উদ্দেশ্য প্রণোদিত প্রচারণা তা নির্ণয় করা দরকার। বিএনপি চেয়ারপারসনের মিডিয়া উইংয়ের সদস্য শায়রুল কবির বলেছেন, তার নেত্রী জেলে গুরুতর অসুস্থ। এটা সত্য হলে তার সুচিকিৎসায় অবিলম্বে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। সে জন্য সরকার বিদেশ থেকে চিকিৎসকও আনাতে পারে।

খালেদা জিয়াকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে বিদেশে যাওয়ার সুযোগ দিলে তার আশঙ্কার দিকটি এই যে, তিনি হয়তো পুত্র তারেক রহমানের মতো দেশে আর ফিরতে চাইবেন না। বিদেশে বসে পুত্রের যোগসাজশে দেশ ও বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে আরও বড় ধরনের চক্রান্ত শুরু করবেন। লন্ডনে আরেকটি কাশিম বাজার কুঠি বানাবেন। বিএনপির যেসব নেতা খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য জামিন দিয়ে বিদেশে পাঠানোর দাবি জানাচ্ছেন, তারা কি গ্যারান্টি দিতে পারেন, চিকিৎসা শেষে অবশিস্ট দণ্ড ভোগের জন্য তিনি দেশে ফিরবেন? না, পুত্র তারেকের পন্থা অনুসরণ করবেন?

এক-এগোরোর আমলেও গৃহবন্দি থাকার সময় খালেদা জিয়া অসুস্থ হয়েছিলেন। কিন্তু চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে চাননি। এক-এগারোর সরকার তাকে তাদের মাইনাস টু পলিসি অনুযায়ী সৌদি আরবে পাঠানোর চেষ্টা করেছিলেন। তার যাত্রার সবকিছু প্রস্তুত, কিন্তু সৌদি দূতাবাস নানা বাহানায় তাকে ভিসা না দেওয়ায় তাকে সৌদি আরবে পাঠানো সম্ভব হয়নি। পরে তো জানাজানি হয়েছে বিএনপির গোপন অনুরোধেই সৌদি সরকার তাকে ভিসা দেয়নি। খালেদা জিয়া বিদেশে যেতে চাননি। তিনি বুঝেছিলেন, দেশ থেকে বেরোলে তার রাজনীতি শেষ।

এবার খালেদা জিয়া নিজেই বিদেশে যেতে উদগ্রীব। দেশে যেসব চিকিৎসক তার চিকিৎসা করছেন, তাদের কেউ কেউ বলেছেন, খালেদা জিয়ার অসুস্থতা গুরুতর নয়। বয়সাধিক্যে যেসব রোগ মানুষের দেহে স্বাভাবিকভাবে বাড়ে, তা তার দেহেও বেড়েছে। দেশেই তার চিকিৎসা সম্ভব। এ কথা যদি সঠিক হয়, তাহলে প্রশ্ন দেখা দেয়, খালেদা জিয়া এবার চিকিৎসার নামে বিদেশে যেতে এত আগ্রহী কেন?

এটা আমার ধারণা, সঠিক হতে পারে, নাও হতে পারে। খালেদা জিয়া বুঝেছেন, তার দল অথবা তার পুত্র, আর কোনো চক্রান্ত বা আন্দোলন দ্বারা তাকে জেল থেকে মুক্ত করতে পারবে না। এই হতাশা থেকে তিনি বিদেশে রাজনৈতিক বনবাসে যেতে চান। যদি এই বনবাস থেকে কোনোদিন দেশে ফিরতে না চান বা না পারেন, তার আপত্তি হবে না। জেলে থাকার চাইতে বনবাসে থাকা ভালো।

এই বনবাসে একটি সুবিধা হবে জামিনের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলেও তিনি দেশে ফিরবেন না। পুত্রের সঙ্গেই বিদেশে থেকে যাবেন। তারপর মাতা-পুত্র মিলে চক্রান্তের ছুরিতে ধার দিতে থাকবেন। চক্রান্ত যদি সফল হয়, তাহলে হিরোর বেশে দেশে ফিরবেন। দেখা যাবে, তার দেহে কোনো গুরুতর রোগই নেই। আর্জেন্টিনার পতিত স্বৈরাচারী ইসাবেলা পেরনের মতো সম্পূর্ণ সুস্থ তিনি। ইসাবেলা পেরনও ক্ষমতায় থাকাকালে দুর্নীতি, অনাচার ও ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য ১৪ বছর কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছিলেন। দণ্ড এড়াবার জন্য তিনি গুরুতর অসুস্থতার ভান করেছিলেন।

বিএনপি বুঝতে পারছে না, বাংলাদেশে খালেদা-তারেকের চক্রান্তের রাজনীতির যুগ শেষ। বিএনপি যদি বাঁচতে চায়, তাকে নতুন নেতৃত্ব ও নীতি খুঁজতে হবে। ড. কামাল হোসেনের ওপর নির্ভর করলে তা হবে তাদের জন্য রাজনৈতিক হারিকিরি। – সমকাল

লন্ডন, ৮ নভেম্বর, শুক্রবার ২০১৯

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment