কালের আয়নায়

আওয়ামী লীগের জন্য আগে আত্মশোধন প্রয়োজন

আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরী –

আওয়ামী লীগের আসন্ন ২১তম জাতীয় সম্মেলন উপলক্ষে ঢাকার দুটি দৈনিকে ইতোপূর্বে আমি দুটি নিবন্ধ লিখেছি। মনে হয়েছিল, অরণ্যে রোদন করেছি। কারণ, তিন দফা একাধিক্রমে ক্ষমতায় বসে থাকা দল প্রবাসী এক সাংবাদিকের কথায় কান দেবে, তা আশা করিনি। ক্ষমতার নেশা সবচেয়ে বড় নেশা। এ নেশায় বুঁদ হলে অনেকেরই আক্কেল জ্ঞান থাকে না।

তাছাড়া এবারের জাতীয় সম্মেলনের আয়োজনও হয়েছে বেশ জমকালো। গত সম্মেলনে প্রচার ও প্রকাশনা উপকমিটির খরচই ছিল এক কোটি ৮৫ লাখ টাকা। এ বছর তা আরও বাড়ানো হবে। এক উপকমিটিই যদি পৌনে দুই কোটি টাকা খরচ করে, তাহলে গোটা সম্মেলনে কত কোটি টাকা খরচ হবে, তার হিসাব সহজেই অনুমান করা যায়।

সম্মেলনে আগতদের খাওয়ানোর জন্যও ব্যাপক আয়োজন করা হয়েছে। খাদ্য উপকমিটির সদস্য সচিব ও সাবেক খাদ্যমন্ত্রী কামরুল ইসলাম প্রকাশ করেছেন, ‘মূল দল ও সহযোগী সংগঠনগুলোর সম্মেলন সামনে রেখে খাদ্য উপকমিটি উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। কৃষক লীগের সম্মেলনে ১০ হাজার প্যাকেট, শ্রমিক লীগের সম্মেলনে ১৫ হাজার প্যাকেট, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের সম্মেলনে ১৫ হাজার প্যাকেট, ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলনে ২০ হাজার এবং কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ সম্মেলনে ৩০ হাজার প্যাকেট খাবার দেওয়া হবে।’

প্রচার ও প্রকাশনা উপকমিটির সদস্য সচিব ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ জানিয়েছেন, সম্মেলনে আগতদের জন্য তারা একটি পাটের ব্যাগে দলের বিভিন্ন প্রকাশনা, দুটি চকলেট, একটি পানির বোতল এবং লেখার জন্য প্যাড ও কলম দেওয়ার ব্যবস্থা তারা করেছেন। তাতে দুটি সিডিও থাকবে। একটিতে সরকারের উন্নয়নমূলক কাজ এবং অন্যটিতে বিএনপির ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের সচিত্র বিবরণ থাকবে। এক কথায় বলা চলে, এবার ঢাকায় ক্ষমতাসীন দলের ২১তম জাতীয় সম্মেলন অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ হবে।

তা হওয়াটাই স্বাভাবিক। একাধিক্রমে তিন দফা ক্ষমতায় থাকা যে দল, দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে যে দলের সরকারের বিস্ময়কর ভূমিকা, তাদের এবারের জাতীয় সম্মেলন একটু ব্যতিক্রমধর্মী হওয়া উচিত এবং তা হচ্ছে। এই নিবন্ধের গোড়াতেই লিখেছিলাম, ক্ষমতার নেশা সবচেয়ে বড় নেশা। এই নেশায় বুঁদ হলে অনেক দলেরই আক্কেল দশা থাকে না। বিএনপি-জামায়াত ক্ষমতায় থাকাকালে তাদের এই আক্কেল দশা ছিল না। আওয়ামী লীগেও ক্ষমতার নেশায় বুঁদ হওয়া নেতাকর্মী থাকলেও এই নেশায় বুঁদ হননি, এমন নেতাকর্মীও আছেন। তাদের কেউ কেউ জাতীয় সম্মেলন সম্পর্কে অন্য দুটি দৈনিকে আমার লেখায় সাড়া দিয়েছেন, কেউ কেউ তাদের সমর্থনের কথা আমাকে জানিয়েছেন। আমি তাদের কাছে কৃতজ্ঞ।

আমি এখন আর তরুণ সাংবাদিক নই। বয়স মধ্য ৮০। বাংলাদেশের অন্তত অর্ধশতাব্দীর রাজনৈতিক উত্থান-পতনের আমি প্রত্যক্ষদর্শী। পাকিস্তান আমলে আইয়ুব খান একবার ঢাকা শহরকে তিলোত্তমা সাজে সাজিয়েছিলেন। উপলক্ষটা ছিল, তার বহু ঘোষিত ‘ডিকেড অব ডেভেলপমেন্ট’ বা উন্নয়ন দশক পূর্ণ হওয়াকে কেন্দ্র করে মৌলিক গণতন্ত্রীদের মহাসম্মেলন। এই উপলক্ষে ঢাকা শহরে মেলা তোরণ নির্মাণ করা হয়েছিল। রাস্তাঘাট জঞ্জালমুক্ত করে ঝকঝকে-তকতকে করা হয়েছিল। সাত দিন ঢাকা শহরকে আলোকমালায় সজ্জিত করা হয়েছিল। ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) কাগজের ঠোঙায় করে জমায়েত লাখখানেক মানুষকে খাবার পরিবেশন করা হয়েছিল। এই ময়দান পরিস্কার করতে সম্মেলনের পর ঢাকা সিটি করপোরেশনের সাত দিন লেগেছিল।

আইয়ুব আমলের অত জাঁকজমক এবারের আওয়ামী সম্মেলনে অবশ্যই হবে না। আইয়ুব ছিলেন বন্দুকের জোরে ক্ষমতা দখলকারী একনায়ক। জনগণের কাছে তার জবাবদিহি ছিল না। জনগণের অর্থ তিনি যথেচ্ছ ব্যয় করতে পারেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ জনগণের দল। জনগণের কাছে তাদের জবাবদিহি রয়েছে। সুতরাং আশা করা যায়, দলের এবারের জাতীয় সম্মেলন বর্ণাঢ্য হবে। আইয়ুবের ডিকেডি সম্মেলনের মতো অর্থ অপচয়ের মহোৎসব হবে না।

আওয়ামী লীগের ২১তম জাতীয় সম্মেলন সম্পর্কে ঢাকার অন্য দুটি দৈনিকে যা লিখেছি, তার পুনরাবৃত্তি এখানে নিষ্প্রয়োজন। আমার বলার কথা, দেশে এখন প্রকৃত রাজনৈতিক দল বলতে একটি দলই আছে। সেটি আওয়ামী লীগ; কিন্তু আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী দলগুলোর অভ্যন্তরীণ অবস্থা ভালো নয়, যুবলীগ ও ছাত্রলীগে পচন ধরেছে। এই পচন থেকে সংগঠন দুটিকে রক্ষা করা প্রয়োজন। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, তার মাথাব্যথা অন্য দল নিয়ে নয়, তার মাথাব্যথা দলে অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে।

আমার ধারণা, শুধু অনুপ্রবেশকারী নয়, গোটা দল সম্পর্কেই শীর্ষ সৎনেতাদের সতর্ক হওয়া উচিত। একটি পচা আমের সঙ্গে দশটি ভালো আম রাখলে, তাও দ্রুত পচে যায়। এটা রাজনৈতিক দল সম্পর্কেও সত্য। আওয়ামী লীগে অনুপ্রবেশকারীরা সবাই অসৎ নয়। কিন্তু অনুপ্রবেশকারীদের যত ক্ষুদ্র অংশই অসৎ হোক, তারা দলের সৎ বৃহত্তম অংশেও দ্রুত পচন ধরিয়েছে। এই পচনশীল অংশ সম্পূর্ণ কেটে ফেলা দরকার। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় পলিটব্যুরোর কয়েকজন প্রভাবশালী সদস্যের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছিল। তাদের শুধু দল থেকে বহিস্কার নয়, ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছিল।

দলের দুস্কৃতিদের ফাঁসিতে ঝোলানো হোক- এমন দাবি আমি করি না। কিন্তু তাদের দৃষ্টান্তমূলক এমন শাস্তি হওয়া দরকার, যাতে দল ও সহযোগী সংগঠনের সব অংশ এ ব্যাপারে সতর্ক হয়ে যায়। মিসরের নাসের দুর্নীতি দমন অভিযান চালাতে গিয়ে নিজের ভগ্নিপতিকে ফাঁসি দিয়েছিলেন। পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর কলকাতার সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ থাকাকালে হিসাবের সামান্য গরমিলের জন্য নিজের জামাইকে কলেজের চিফ ক্যাশিয়ারের পদ থেকে বরখাস্ত করে বলেছিলেন, ‘আমার যদি তোমাকে আরও শাস্তিদানের ক্ষমতা থাকত, তাহলে সেই শাস্তি তোমাকে দিতাম।’ এ যুগে এসব উদাহরণ টেনে লাভ নেই। কারণ, সর্ষের মধ্যেই ভূত, ভূত তাড়াবে কে?

আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল মহল থেকে বলা হয়েছে, ‘আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় তারুণ্য নির্ভর একটি দল গড়ার দিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন আওয়ামী লীগ সভানেত্রী। সেই বিবেচনায় বর্তমান কেন্দ্রীয় কমিটির নিষ্ক্রিয়, বিতর্কিত ও জনগণের দ্বারা অভিযুক্ত নেতাদের বাদ দেওয়া হবে। এতদিন যারা ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে বেশি ব্যস্ত রয়েছেন, তাদেরও রাখা হবে না নতুন কমিটিতে। সম্পাদকমণ্ডলীর যেসব সদস্য নিজেদের দায়িত্ব ঠিকমতো পালন করেননি, তাদেরও বাদ দেওয়া হবে। তাদের বদলে সাবেক ছাত্রনেতাদের মধ্য থেকে মেধাবী, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতাদের গ্রহণ করা হবে।

ওপরের খবরটা পড়ে ভাবছি, ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় না হয়। ধীরে রজনী ধীরে। মেধাবী, পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির আদর্শ চরিত্রের লোক পাওয়া যাবে কোথায়? ছাত্রলীগে, যুবলীগে? অভিযোগের তীরটা তো এই দুই সংগঠনের বিরুদ্ধেই বেশি। আর তারুণ্যও কি খুঁজে পাওয়া যাবে এই দুই সংগঠনে? যুবলীগের অপসারিত নেতার বয়স ৭২ বছর। ছাত্রলীগে ৪০-৫০ বয়সের নেতার সারি পাওয়া যাবে। এর চেয়ে নেতা বাছাইয়ের পরিধিটা আরও বাড়ানো হোক। স্থানীয়ভাবে জনমত যাচাইয়ের ভিত্তিতে এই নতুন নেতৃত্ব মূল ও সহযোগী সংগঠনগুলোর জন্য সংগ্রহ করতে হবে। এই জনমত যাচাইয়ের ভারও যেসব এমপির বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে, তাদের হাতে না দিয়ে কেন্দ্রীয় নেতাদের সৎ ও দায়িত্বশীল অংশের হাতে রাখতে হবে।

আগামী জাতীয় সম্মেলনে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনগুলোকে ‘ফেরেশতার দল’ নয়, যদি দোষে-গুণে মিশ্রিত, কিন্তু জনগণের কাছে গ্রহণযোগ্য সংগঠন হিসেবে গড়ে তোলা যায় এবং আমলাচক্রের প্রভাবমুক্ত এই কমিটি স্বাধীনভাবে কাজ করার শক্তি ও সুযোগ পায়, সেটাই হবে এই অধিবেশনের সবচেয়ে বড় অর্জন। জাতীয় সংসদকে যদি দুর্নীতিবাজ এমপি ও তাদের আমলা-পার্টনারদের কবল থেকে মুক্ত করে সিকিভাগও সৎ ও দায়িত্বশীল এমপিদের প্রভাব বাড়ানো যায়, তাহলে দেশ প্রকৃত জন হিতকর রাষ্ট্র হওয়ার দিকে এগিয়ে যাবে। রাষ্ট্র পরিচালনায় মন্ত্রিসভাও তাদের স্বাধীন ইচ্ছা ও সিদ্ধান্ত দ্বারা চালিত হবে। উপদেষ্টা পরিষদ যেন তাদের ঘাড়ে সিন্ধবাদের দৈত্য না হয়।

আওয়ামী লীগের উচিত, দেশে একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক বিরোধী দল গড়ে ওঠার কাজে সাহায্য জোগানো। সেই বিরোধী দল আওয়ামী লীগের বিরোধী হবে; কিন্তু বিএনপি-জামায়াতের মতো স্বাধীনতার আদর্শের বিরোধী হবে না। – সমকাল

লন্ডন, ১৫ নভেম্বর শুক্রবার, ২০১৯

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment