দশ দিগন্তে

মিলিটারি, না সিভিল স্বেচ্ছাতন্ত্র কোনটি বেশি খারাপ?

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

সম্প্রতি একটি লেখা পড়েছি একটি ব্রিটিশ জার্নালে। সিভিল ডিকটেটরশিপ কি মিলিটারি ডিকটেটরশিপের চেয়ে ভালো? কৌতূহলি হয়ে পড়েছি। আমরা বাঙালিরা তো দীর্ঘকাল পাকিস্তানি ও বাংলাদেশি মিলিটারি ডিকটেটরশিপের অধীনে বাস করেছি। বিএনপি-জামায়াতের আমলে সিভিল ডিকটেটরশিপের আস্বাদও লাভ করেছি। এখনো কিছুটা পাচ্ছি না তা নয়। তবে পুরোপুরি সিভিল ডিকটেটরশিপের শাসন আমরা দেখিনি। দেখতে হবে কি না জানি না।

লেখক দেখিয়েছেন, সিভিল একনায়কত্বের চেয়ে মিলিটারি একনায়কত্ব তুলনামূলকভাবে ভালো। কারণ, তারা বন্দুক দেখিয়ে ক্ষমতায় আসেন। তার দেশের মানুষ শুরু থেকেই জানে, এই বন্দুকধারীরা ক্ষমতা অপহরণকারী এবং জনগণের শত্রু। সুতরাং এই শত্রুর বিরোধিতায় তারা এককাট্টা হয়; কিন্তু সিভিল একনায়কত্ব আসে গণতন্ত্রের ছদ্মবেশে। কোনো কোনো সিভিল একনায়ক নির্বাচনে জয়ী হয়েও ক্ষমতায় আসেন। যেমন গত শতকের হিটলার কিংবা বর্তমান শতকের ডোনাল্ড ট্রাম্প।

ব্রিটিশ জার্নালের এই লেখাটিতে আরো অনেকের নাম সিভিল একনায়ক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন ইন্দিরা গান্ধী, মার্গারেট থ্যাচার প্রমুখ। আমি এর সঙ্গে সহমত পোষণ করি না। ইন্দিরা গান্ধী এবং মার্গারেট থ্যাচার জীবিত থাকাকালে অনেক মিডিয়ায় অবশ্য তাদের ‘ইলেকটিভ ডিকটেটর’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে; কিন্তু অনেক সময় কোনো কোনো দেশের জনগণ বারবার নির্বাচনে ভোট দিয়ে তাদের কোনো কোনো নেতাকে দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষমতায় রাখে নিজেদের এবং দেশের কল্যাণের স্বার্থে। যেমন নেহরু, ইন্দিরা, মার্গারেট থ্যাচার, লিকুয়ান, মাহাথির প্রমুখ। এদের ডিকটেটর বলতে হলে বলতে হবে ‘বেনিফিসিয়াল ডিকটেটর বা জনহিতকর একনায়ক’। কোনো কোনো সময় কোনো কোনো দেশে এটা দরকার হয়।

ব্রিটিশ জার্নালের লেখক সিভিল বা মিলিটারি একনায়কত্ব বলতে এক ব্যক্তির শাসন বোঝাননি। বুঝিয়েছেন এক ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে একটি গোষ্ঠী বা জান্তার শাসন। এই জান্তা মিলিটারি অথবা সিভিলও হতে পারে। প্রাচীনকালে রাজা-বাদশাহ বা এক ব্যক্তির শাসন সম্ভব ছিল। বিশ বা একুশের উন্নত ও জটিল বিশ্বে তা সম্ভব নয়। গত শতকের শেষ দিকে কথাটা ব্যাখ্যা করে বলেছিলেন পাকিস্তানের সামরিক জান্তার নেতা জেনারেল আইয়ুব।

তাকে পশ্চিমা এক সাংবাদিক জিজ্ঞাসা করেছিলেন, তিনি নিজেকে একজন মিলিটারি ডিকটেটর বলে স্বীকার করেন কি না? আইয়ুব জবাব দিয়েছিলেন, এযুগে এক ব্যক্তির শাসন সম্ভব নয়, তা মিলিটারি হোক বা সিভিল হোক। আধুনিক যুগে রাষ্ট্র-কাঠামো এতো বিশাল ও জটিল (big and complex) হয়েছে যে, এক ব্যক্তির পক্ষে একা তা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। তাকে সিভিল, মিলিটারি বুরোক্রেসি, টেকনোক্রাসি, এমনকি একশ্রেণির রাজনৈতিক উপদেষ্টা দ্বারা চালিত হতে হয়। এটাকে মিলিটারি অথবা সিভিল জান্তা বলতে পারেন, একনায়কত্ব নয়।

ব্রিটিশ লেখকের কথায় আসি। তিনি যে বলেছেন, মিলিটারি ও সিভিল ডিকটেটরশিপ দুই-ই জনগণের শত্রু হলেও তুলনামূলকভাবে সিভিল ডিকটেটরশিপ দেশ ও জনগণের জন্য বেশি অকল্যাণকর, একথার সঙ্গে আমি সহমত পোষণ করি। বন্দুকধারী স্বেচ্ছাতন্ত্রের চেহারাটা চেনা যায়। তার বিরুদ্ধে জনগণের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামও সহজ এবং সম্ভব। এজন্য মিলিটারি ডিকটেটরেরাও ক্ষমতা দখলের কিছুদিন পরই তাদের খাকি পোশাক ছেড়ে দিয়ে সিভিল ড্রেসে রাজনীতিকের বেশে জনগণের সামনে আসেন। এটা আমরা হিটলার, আইয়ুব, জিয়াউর রহমান, এরশাদ সকলের ব্যাপারে ঘটতে দেখেছি।

জনগণ বা দেশবাসীর সঙ্গে সিভিল ডিকটেটরদের (বেনিফিসিয়াল ডিকটেটরদের কথা বলছি না) প্রতারণা অনেক বেশি বড়ো। তাদের অনেকেই প্রথমে নির্বাচনের মাধ্যমে গণতন্ত্রের ছদ্মবেশে ক্ষমতায় আসেন। তারপর ধীরে ধীরে তারা নিজের চেহারা পালটে ফেলেন। নির্বাচনের পাট তুলে দেন অথবা নির্বাচনী প্রহসন দ্বারা নিজেকে বারবার নির্বাচিত করেন। ১৯৯৬ সালে বাংলাদেশে ফেব্রুয়ারি-নির্বাচনে যা করতে চেয়েছিলেন খালেদা জিয়া। দেশ শাসনে সিভিল ডিকটেটরশিপ ধীরে ধীরে আমলাতন্ত্র এবং পুলিশের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। মিলিটারি থাকে ব্যাক গ্রাউন্ডে। তাদের স্থান দখল করে পুলিশ। সর্ব প্রকার দুর্নীতি ও সন্ত্রাসের ফায়দা লোটে তারা। জনগণকে ক্ষমতার দাপট দেখায় তারা। এই ধরনের দেশ শেষ পর্যন্ত পুলিশি স্টেটে (Police state) পরিণত হয়।

এই ধরনের স্টেটের একটা উদাহরণ ইসাবেলা পেরনের আর্জেন্টিনা। মশিয়ে পেরন ও মাদাম ইন্ডা পেরনের জনহিতকর শাসনের পর ক্ষমতায় আসেন পেরনের দ্বিতীয় স্ত্রী ইসাবেলা পেরন। যেমন দুর্নীতিবাজ, তেমনই সন্ত্রাসের সম্রাজ্ঞী। তার একটি মন্ত্রিসভা ছিল; কিন্তু আমলাদের মধ্য থেকে বেছে বেছে তার পছন্দের আমলাদের দিয়ে তিনি একটি উপদেষ্টা পরিষদ গঠন করেছিলেন। এদের লুটপাট, অত্যাচারে আর্জেন্টিনার মানুষ দীর্ঘকাল জর্জড়িত হয়েছে। এদের ক্ষমতা ছিল মন্ত্রীদের চেয়ে অনেক বেশি।

ইসাবেলা-প্রশাসনের লাভের বখরা পেয়েই সামরিক বাহিনী তুষ্ট ছিল। দেশ চালাত পুলিশ। এরা ইসাবেলা-বাহিনী নামে পরিচিত হয়েছিল। রাজনীতিকরা দেশের অবস্থা সম্পর্কে মুখ খুললেই চরম নির্যাতনের শিকার হতেন; কিন্তু শেষ পর্যন্ত একটা বড়ো ভুল করে ফেললেন ইসাবেলা। তিনি একবার নির্বাচনে জয় নিশ্চিত করার জন্য একটি রাজনৈতিক জোট গঠন করেন; কিন্তু ক্ষমতায় পুনরায় বসার পরেই এই জোটের রাজনীতিকদের একে একে পরিত্যাগ করেন। অসন্তুষ্ট রাজনীতিকরা তার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হন এবং দেশে গণআন্দোলন গড়ে তোলেন। এই আন্দোলনেই তার ১৪ বছরের শাসনের অবসান। তিনি দেশ ছেড়ে পালান। দুর্নীতি, সন্ত্রাস, ক্ষমতার অপব্যবহারের জন্য আদালত তাকে ১৪ বছর সাজা দিয়েছিল।

পুলিশ স্টেট এবং তার সিভিল একনায়কের আরেকটি দৃষ্টান্ত সালাজারের পর্তুগাল। সালাজার মিলিটারি শাসক ছিলেন না। ছিলেন সিভিল শাসক; কিন্তু পর্তুগালে তার শাসন, স্পেনে জেনারেল ফ্রাঙ্কর ৪০ বছরের ফ্যাসিস্ট-শাসনের অত্যাচার ও নিপীড়নের রেকর্ড ভেঙে দিয়েছিল।

ব্রিটিশ লেখক তার লেখায় সিভিল স্বেচ্ছাতন্ত্রের আরো একটি মন্দ দিক দেখিয়েছেন। মিলিটারি-শাসনের বন্দুকধারী চরিত্র নগ্ন হওয়াতে কোনো দেশে এলিট শ্রেণি এবং বুদ্ধিজীবী শ্রেণির একটা সুবিধাবাদী ও সুযোগ সন্ধানী অংশ প্রকাশ্যে সেই শাসনকে সমর্থন দিতে ও সহযোগিতা দিতে লজ্জা পান। পাছে, জনগণ তাদের ধরে ফেলে। বাংলাদেশে এক-এগারোর আমলে তাই আমাদের বুদ্ধিজীবীদের একাংশ তাদের ঘোমটা দিয়ে সমর্থন জুগিয়েছেন। একজন ড. সেনাপ্রিয় ভট্টাচার্য্য অবশ্য প্রকাশ্যেই সমর্থন দিয়েছেন ও সুবিধা লুটেছেন।

মিলিটারি শাসনে নিজেদের আসল চেহারা দেখাতে একশ্রেণির বুদ্ধিজীবীর যে লজ্জা, সিভিল একনায়কত্বের আমলে সেই লজ্জা থাকে না। কারণ, এই একনায়কত্বের একটা গণতান্ত্রিক ছদ্মবেশ থাকে। উন্নয়নশীল বিশ্বের অনেক দেশের মধ্যে বাংলাদেশের এলিট ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণির বড়ো অংশ তাই ছদ্মবেশি স্বেচ্ছাতন্ত্রের জয়গান গাইতে বেশি পটু।

সিভিল ও মিলিটারি ডিকটেটরশিপের মধ্যে সিভিল ডিকটেটরশিপই যে জনগণ—বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশগুলোর জনগণের জন্য বেশি ক্ষতিকর, এই সত্যটির দিকে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে ব্রিটিশ লেখক ভালো করেছেন। কারণ, মিলিটারি ডিকটেটরশিপের বদলে সিভিল ডিকটেটরশিপেরই দেশে দেশে এখন প্রসার ঘটছে বেশি। – ইত্তেফাক

[ লন্ডন, ১৬ নভেম্বর, শনিবার, ২০১৯ ]

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment