তৃতীয় মত

সিপিবির অধিবেশনে উচ্চারিত কথাটি খুবই মূল্যবান

আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী –

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি তথা সিপিবির জাতীয় পরিষদের ২৫তম অধিবেশন সম্প্রতি হয়ে গেল ঢাকার পুরানা পল্টনের মুক্তি ভবনে।

আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনের মহা জাঁকজমকের পাশাপাশি সিপিবির এই নিষ্প্রভ জাতীয় পরিষদের সভা হয়তো অনেকের কাছে গুরুত্ব পায়নি। এই সভায় সেই পুরনো রেটোরিক উচ্চারিত হয়েছে।

রেটোরিকটি হল দেশে বাম বিকল্পশক্তি গড়ার আহ্বান। এ যেন যেখানে রাম নেই সেখানে রামায়ণ রচনার ডাক। যে দেশে বাম নেই, সে দেশে বাম বিকল্পশক্তি গড়ার দিবাস্বপ্ন।

এ নিয়ে ঢাকার অন্য একটি দৈনিকে আমার কলামে বিশদ আলোচনা করেছি। এখানে অন্য প্রসঙ্গে আসছি।

সিপিবির সভাপতি কমরেড মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের কণ্ঠে ‘বাম বিকল্পশক্তি’ গড়ার রেটোরিকটি উচ্চারিত হলেও তার ভাষণে এমন আরেকটি কথা উঠে এসেছে, যা দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার জন্য শুধু প্রাসঙ্গিক নয়, গুরুত্বপূর্ণও।

দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের সভায়, এমনকি ক্ষমতাসীন দলের সাম্প্রতিক কাউন্সিল অধিবেশনেও দেশের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ এই কথাটি আলোচিত হতে শোনা যায়নি।

কমরেড সেলিম বলেছেন, ‘দেশ জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে এক কঠিন দিনের মুখোমুখি। বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের পাশাপাশি ভারতের বৃহৎ পুঁজির আগ্রাসী আধিপত্য আমাদের ওপর চেপে বসেছে। ভারতের বৃহৎ পুঁজি এখন সাম্প্রদায়িকতাকে বহন করছে। মোদির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির পৃষ্ঠপোষক আম্বানি শিল্পগোষ্ঠী।’

সেলিম আরও বলেছেন, ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধন আইন ও এনআরসি ভারতীয় সমাজ ও রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক বিভাজন গভীর করেছে। এটার প্রভাব পড়বে সারা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতেও।

সেলিমের বক্তব্যের সূত্র ধরে সিপিবির সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম বলেছেন, ‘ভারতে সাম্প্রদায়িক পুঁজিবাদের অভ্যুদয় শুধু ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। এর বিরুদ্ধে দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের ঐক্যবদ্ধ লড়াই জরুরি হয়ে পড়েছে।’

সেলিম এবং শাহ আলম বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও তার অসাম্প্রদায়িক চরিত্র রক্ষার জন্য এই মুহূর্তে একান্ত প্রয়োজন একটি সাবধানবাণী উচ্চারণ করেছেন। এজন্য জাতি একদিন তাদের কাছে কৃতজ্ঞ থাকবে।

পাকিস্তান আমল থেকে বাংলাদেশে সিপিবি, মুজাফফর ন্যাপ ভারত সমর্থক দল বলে পরিচিত। ভাসানী ন্যাপ এবং খণ্ড খণ্ড কমিউনিস্ট গ্রুপগুলো পরিচিত ছিল চীনপন্থী হিসেবে। এজন্যই সাম্প্রতিককালে সিপিবির মঞ্চ থেকে বর্তমান ভারতের সাম্প্রদায়িক বৃহৎ পুঁজির আগ্রাসী চেহারা সম্পর্কে সতর্কবাণী উচ্চারিত হওয়ায় অনেকে বিস্মিত।

কিন্তু একটু খতিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে, এটা ভারত বা ভারতের জনগণের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নয়। এটা ভারতে ক্ষমতা দখলকারী উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের অনুসৃত আগ্রাসী ও আধিপত্যবাদী বৃহৎ পুঁজির বিরুদ্ধে আগাম সতর্কবাণী। এই হিন্দুত্ববাদী পুঁজিবাদের আগ্রাসনে ভারতের জনগণও আজ নিষ্পিষ্ট। বিপন্ন দক্ষিণ এশিয়ার জনগণ।

তাই রামের ছদ্মাবরণে ভারতে রাবণের এই অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে দক্ষিণ এশিয়ার জনগণের ঐক্যবদ্ধ সংগ্রাম ছাড়া তাদের মুক্তি নেই। সময় থাকতে সিপিবির মঞ্চ থেকে এই সাবধানবাণীটি উচ্চারিত হয়েছে।

বিএনপি নেতারা এখন সুযোগ পেয়ে বলতে পারেন, ভারত সম্পর্কে আমরা এতকাল যে কথাটা বলে এসেছি, এখন সিপিবিও সে কথা বলছে। বিএনপি এ দাবি করলে তা সত্য বলে মানা যাবে না। বিএনপির ভারত বিরোধী প্রচারণা সাম্প্রদায়িক। সিপিবির ভারত সম্পর্কিত বর্তমান বিশ্লেষণ বাংলাদেশের জাতীয় এবং গোটা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক স্বার্থভিত্তিক।

বিএনপির মিথ্যা প্রচারণা ছিল, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়ী হলে ভারত বাংলাদেশ দখল করে নেবে, এক দশমাংশ ইতিমধ্যেই দখল করে নিয়েছে। মসজিদে উলুধ্বনি শোনা যাবে, ইত্যাদি। এটা ছিল ভারত বিদ্বেষী প্রচারণা, ভারতের জনগণের সঙ্গেও শত্রুতা।

বিএনপি-জামায়াতের এই ভারতবিরোধী সাম্প্রদায়িক প্রচারণা, বাংলাদেশের কিংবা ভারতের মুসলমানদেরও কোনো উপকার করেনি। বরং ভারতের সাম্প্রদায়িক শক্তিকে আরও শক্তি জুগিয়েছে।

ভারতে এই হিন্দুত্ববাদী বৃহৎ পুঁজিবাদীরা যখন প্রথম ক্ষমতায় আসে, তখন বিএনপি উল্লাসে মাতোয়ারা হয়েছে। তাদের সাহায্যে ক্ষমতায় আসতে চেয়েছিল, তারেক রহমানের সঙ্গে ভারতের আম্বানি শিল্পগোষ্ঠীর এককালের যোগাযোগ ও সম্পর্কের কথা এখন আর কারও অজানা নয়।

ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষার সঙ্গে জাতীয় স্বার্থরক্ষার ব্যাপারে এখন পর্যন্ত হাসিনা সরকারের ভূমিকা প্রশংসনীয়।

এই সরকার ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অমীমাংসিত সমস্যাগুলোর অধিকাংশের দ্রুত মীমাংসা করে বড় প্রতিবেশীর সঙ্গে মিত্রতার সম্পর্ক স্থাপন করেছে। দেশের স্বার্থেই প্রতিবেশীর সরকার যে চরিত্রেরই হোক তার সঙ্গে সুসম্পর্ক রক্ষা করে চলেছে।

কিন্তু ভারত মহাসাগর থেকে হিন্দুত্ববাদের রাক্ষস যাতে উঠে এসে বাংলাদেশকে গ্রাস করতে না পারে সেজন্য সতর্কতাও অবলম্বন করেছে।

এই সতর্কতা হল চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক ও বাণিজ্য সম্পর্ক দ্রুত বৃদ্ধি। পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে হাসিনা সরকারের এই ভারসাম্য রক্ষার নীতি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার সহায়ক একথা অনেকেই এখন স্বীকার করছেন।

বাংলাদেশের নব্য পুঁজিবাদীদের একটা বড় অংশের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, পাকিস্তানের কাছ থেকে মুখ ফিরিয়ে এখন ভারতের হিন্দুত্ববাদী বৃহৎ পুঁজির সঙ্গে আঁতাত স্থাপন করা। এটা যে দেশের সর্বনাশ করবে এ সম্পর্কে তারা মোটেও সতর্ক নয়। দেশপ্রেমের অভাব না হলে এমনটা হয় না।

বাংলাদেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণ বহুমুখী করার ব্যাপারে প্রাইভেট সেক্টরে যেসব ব্যবসায়ী সাহসের সঙ্গে এগিয়েছেন, তাদের মধ্যে সৈয়দ আবুল হোসেনের নাম উল্লেখ করতে আমি দ্বিধাবোধ করছি না। মন্ত্রী থাকাকালেও তিনি দেশের বাণিজ্য সম্পর্ক বহুমুখীকরণে পদক্ষেপ নিয়ে নানা দুর্নাম সহ্য করেছেন।

কথায় বলে ‘মল খায় সব মাছে, দোষ পড়ে পাঙ্গাশ মাছের’। তেমনি পদ্মা সেতু নির্মাণে নানা দুর্নাম তিনি অহেতুক বহন করেছেন। তাকে এবার মন্ত্রিত্বে ফিরিয়ে আনা হলে ভালো হতো।

বাংলাদেশসহ ভারতের পূর্ব সীমান্তে হিন্দুত্ববাদী বৃহৎ পুঁজির আগ্রাসন অনেকটা ঠেকিয়ে দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জির তৃণমূল কংগ্রেস। ত্রিপুরার বামফ্রন্ট তা পারেনি। মমতা ‘মুসলিম সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের’ কবলে পড়েছেন। এদিক থেকে শেখ হাসিনার সাফল্যের আমি প্রশংসা করি।

তিনি এক হাতে ইসলামী জঙ্গি দমন করেছেন, অন্য হাতে হিন্দুত্ববাদী বৃহৎ পুঁজির আগ্রাসন থেকে বাংলাদেশকে রক্ষা করে চলেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের নব্য পুঁজিবাদীদের অধিকাংশ তার মিত্র নয়। মুখে ভারতবিরোধী জিগির এবং কাজে ভারতের বৃহৎ পুঁজির সঙ্গে আঁতাত, এখন বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য একটা হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই হুমকি ঠেকাতে হলে বাংলাদেশে ডান-বাম নির্বিশেষে গণতান্ত্রিক ঐক্য প্রয়োজন। সিপিবি বাম বিকল্পশক্তি গঠনের ডাক দিয়েছে। আমি বলি এই ডাক হওয়া উচিত বৃহত্তর গণতান্ত্রিক ঐক্যের। এই ঐক্য ছাড়া দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ রক্ষা করা যাবে না। – যুগান্তর

লন্ডন, ২৯ ডিসেম্বর রবিবার, ২০১৯

খবরটি শেয়ার করুন

Post Comment